পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

ভূমিকা

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী দুটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত। পশ্চিম পাকিস্তান এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর মধ্যে কেবল দূরত্বের ব্যবধানই ছিল না, ছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিশাল এক পাহাড়। এই বৈষম্য ছিল পরিকল্পিত, যা শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বরূপ

পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল প্রকট। পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে, বিশেষ করে সামরিক খাতের উন্নয়নে। পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদিত কাঁচামাল ও বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে রপ্তানি করে যে আয় হতো, তার একটি বড় অংশ ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়নের জন্য।

শিল্পায়ন ও উন্নয়নের চিত্র

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পশ্চিম পাকিস্তানে প্রচুর কলকারখানা, অবকাঠামো এবং নতুন রাজধানী শহর গড়ে তোলা হয়েছিল। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তান কেবল কাঁচামাল সরবরাহের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আদমজী জুট মিলের মতো কিছু উদ্যোগ থাকলেও, পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা কখনোই পর্যাপ্ত মূলধন ও সুযোগ-সুবিধা পাননি। ফলস্বরূপ, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মাথাপিছু আয় পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে নিচে ছিল।

সম্পদ পাচার ও বঞ্চনার ইতিহাস

অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহানসহ তৎকালীন অনেক অর্থনীতিবিদ তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, কীভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সম্পদ প্রতিনিয়ত পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের পাট ছিল 'গোল্ডেন ফাইবার' বা সোনালী আঁশ, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল চাহিদা সম্পন্ন ছিল। কিন্তু এই পাটের অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে করাচি, লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডির আধুনিকায়ন।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বৈষম্য

উন্নয়নের বৈষম্য কেবল অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি কর্মসংস্থান ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে। উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরিতে বাঙালিদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিটি স্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি আমলাদের দখলে, যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের নিজস্ব স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

রাজনৈতিক প্রভাব ও বৈষম্যের সম্পর্ক

অর্থনৈতিক বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাঙালিদের কোনো ভূমিকা ছিল না। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি ছিল এই বৈষম্য নিরসনের একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী একে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করে বঞ্চনার নীতি অব্যাহত রাখে।

পরিণতি: বৈষম্য থেকে স্বাধীনতা

এক দশকের ব্যবধানে এই অর্থনৈতিক বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়। ফলাফলস্বরূপ, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

উপসংহার

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব নয়, এটি ছিল একটি মানবিক বিপর্যয়। শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রধান অনুপ্রেরণা। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা যে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি, তা মূলত সেই বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিজয়েরই প্রতিফলন।

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.

Related Articles
About Author
THR
THR